বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দামের ঊর্ধ্বগতি এখনো থামেনি। বিভিন্ন দেশের বাড়তে থাকা সরকারি ঋণ, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর স্বর্ণ ক্রয় এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা সব মিলিয়ে মূল্যবান ধাতুটির চাহিদা বাড়ছে। একই সঙ্গে সুদহারের সঙ্গে স্বর্ণের দামের যে পুরনো সম্পর্ক ছিল, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় তা অনেকটাই বদলে গেছে। ফলে স্বর্ণের দাম আরো বাড়ার সুযোগ রয়েছে বলে মনে করছেন ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের বিশ্লেষকরা।
১৯৭১ সালে ব্রেটন উডস মুদ্রা ব্যবস্থা ভেঙে যাওয়ার পর বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম স্বাধীনভাবে নির্ধারিত হতে শুরু করে। এরপর স্বর্ণের বাজারে তিনটি বড় ঊর্ধ্বমুখী ধারা দেখা গেছে। প্রথমটি ছিল ১৯৭১-৮০ সাল পর্যন্ত। দ্বিতীয়টি ১৯৯৯-২০১১ সাল পর্যন্ত। আর সর্বশেষ ঊর্ধ্বমুখী ধারা শুরু হয় ২০১৮ সালে, যা এখনো চলমান।
সত্তর দশকে স্বর্ণের দাম যে হারে বেড়েছিল, তা ছিল আধুনিক ইতিহাসে বড় কোনো সম্পদের মূল্যের সবচেয়ে নাটকীয় প্রবৃদ্ধিগুলোর একটি। ১৯৭১-৮০ সালের মধ্যে স্বর্ণের দাম বছরে গড়ে প্রায় ৪৬ শতাংশ বেড়েছিল। সে সময় আন্তর্জাতিক মুদ্রা ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন, নেতিবাচক প্রকৃত সুদহার, ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং বিভিন্ন দেশের বাড়তে থাকা বাজেট ঘাটতি স্বর্ণের দাম বাড়াতে ভূমিকা রাখে।
বর্তমান ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা শুরু হয় ২০১৮ সালে। এ সময়ে স্বর্ণের দাম বছরে গড়ে প্রায় ১৯ শতাংশ বেড়েছে। শুরুতে কম প্রকৃত সুদহার এবং করোনাভাইরাস মহামারীর সময় বিভিন্ন দেশের বড় অংকের অর্থনৈতিক প্রণোদনা স্বর্ণের দাম বাড়াতে সহায়তা করে। তবে ২০২২ সালের পর স্বর্ণের বাজারে আরো বড় পরিবর্তন দেখা যায়।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রকৃত সুদহারের সঙ্গে স্বর্ণের দামের একটি শক্তিশালী বৈপরীত্য ছিল। সাধারণত প্রকৃত সুদহার ১ শতাংশীয় পয়েন্ট বাড়লে স্বর্ণের দাম প্রায় ১৪ শতাংশ কমত। কারণ স্বর্ণ থেকে কোনো সুদ পাওয়া যায় না। ফলে সুদহার বাড়লে বিনিয়োগকারীদের কাছে সুদ পাওয়া যায় এমন সম্পদ বেশি আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।
কিন্তু ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর এ সম্পর্ক অনেকটাই বদলে যায়। ওই সময় পশ্চিমা দেশগুলো রাশিয়ার প্রায় ৬৩ লাখ কোটি ডলারের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আটকে দেয়। এসব সম্পদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বন্ড, জার্মানির সরকারি বন্ড ও যুক্তরাজ্যের সরকারি ঋণপত্র ছিল।
এ ঘটনায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সরকারি তহবিল নতুন করে নিরাপদ সম্পদ নিয়ে ভাবতে শুরু করে। কোনো দেশের বৈদেশিক সম্পদ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে আটকে যেতে পারে, এ ঝুঁকি সামনে আসায় স্বর্ণের গুরুত্ব বাড়ে। কারণ স্বর্ণ কোনো দেশের দায় নয় এবং সাধারণত কোনো সরকারের সিদ্ধান্তে তা আটকে দেয়ার ঝুঁকি তুলনামূলক কম।
এরপর বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্বর্ণ কেনা বাড়িয়েছে। উন্নয়নশীল দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সরকারি তহবিলগুলোর রিজার্ভে স্বর্ণের অংশ ২০২২ সালের প্রায় ৫ শতাংশ থেকে বেড়ে বর্তমানে প্রায় ১১ শতাংশ হয়েছে। তবে উন্নত দেশগুলোর তুলনায় এ হার এখনো কম। উন্নত দেশগুলোর রিজার্ভে স্বর্ণের অংশ প্রায় ২৬ শতাংশ।
সাম্প্রতিক বাজারের তথ্যেও স্বর্ণের পরিবর্তিত অবস্থান স্পষ্ট। ২০২২ সালের মার্চ থেকে ২০২৩ সালের অক্টোবর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের পাঁচ বছর মেয়াদি সরকারি ঋণপত্রের প্রকৃত সুদহার ৪ শতাংশীয় পয়েন্টের বেশি বেড়েছিল। পুরনো সম্পর্ক অনুযায়ী, এতে স্বর্ণের দাম প্রায় ৫৫ শতাংশ কমার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে স্বর্ণের দাম উল্টো ৭ শতাংশ বেড়েছে।
পরবর্তী দুই বছরে ব্যবধান আরো স্পষ্ট হয়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রকৃত সুদহার ১ শতাংশীয় পয়েন্টেরও কম কমলেও স্বর্ণের দাম বেড়েছে প্রায় ১১০ শতাংশ। অর্থাৎ সুদহার বাড়ার সময় স্বর্ণের দাম আগের মতো চাপের মুখে পড়ছে না। আবার সুদহার কমলে দাম দ্রুত বাড়ছে।
স্বর্ণের বাজারে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে শেয়ার ও সরকারি ঋণপত্রের সম্পর্কের ক্ষেত্রে। সাধারণত শেয়ারবাজারে ঝুঁকি বাড়লে বিনিয়োগকারীরা সরকারি ঋণপত্রে অর্থ রাখেন। কিন্তু গত পাঁচ বছরের মুদ্রাস্ফীতির সময়ে অনেক ক্ষেত্রে শেয়ারের দরপতনের সময় সরকারি ঋণপত্রও বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশিত সুরক্ষা দিতে পারেনি। ফলে বিনিয়োগের ঝুঁকি কমাতে স্বর্ণের গুরুত্ব বেড়েছে।
ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের হিসাবে, ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর মোট আর্থিক সম্পদের মাত্র ৩ শতাংশ স্বর্ণে বিনিয়োগ করা আছে। ফলে ভবিষ্যতে স্বর্ণে বিনিয়োগ আরো বাড়ার সুযোগ রয়েছে। তবে স্বর্ণের দামের পক্ষে সবচেয়ে বড় দীর্ঘমেয়াদি বিষয়গুলোর একটি হলো বিভিন্ন দেশের সরকারি ঋণ। যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ঋণ এরই মধ্যে প্রায় ৩২ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। আগামী এক দশকে তা আরো প্রায় ৩২ ট্রিলিয়ন ডলার বাড়তে পারে। একই সময়ে দেশটির বাজেট ঘাটতিও বড় থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
সুত্র:বণিক বার্তা
