রয়টার্স এক্সক্লুসিভ

আরো শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করতে কারখানা সম্প্রসারণ করছে সৌদি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৪:৫৬ পিএম, শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬ | ৮০

সৌদি আরবের একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনকেন্দ্র বা কারখানা সম্প্রসারণের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। এতে দেশটি আরো বড় ও শক্তিশালী কঠিন জ্বালানিচালিত ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করতে পারবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এসব ক্ষেপণাস্ত্র আরো দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে কিংবা বেশি ওজনের বিস্ফোরক বহন করতে সক্ষম হতে পারে। এক বছরের বেশি সময়ের বাণিজ্যিক স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে দুই মার্কিন গবেষক এমন ধারণা দিয়েছেন।

ওই গবেষকদের মতে, ক্ষেপণাস্ত্রের সক্ষমতা বাড়লে ইরানের সম্ভাব্য হামলা প্রতিরোধে সৌদি আরবের সামরিক সক্ষমতা জোরদার হতে পারে। পাশাপাশি সামরিক সরঞ্জামের ক্ষেত্রে দেশটির স্বনির্ভরতা বাড়বে। ইয়েমেনে ইরানের সমর্থনপুষ্ট হুথি বিদ্রোহীদের সঙ্গে সংঘাতের ক্ষেত্রেও এটি সৌদি আরবের অবস্থান শক্তিশালী করতে পারে।

তবে এ উদ্যোগ মধ্যপ্রাচ্যে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিযোগিতা আরো বাড়িয়ে দিতে পারে। একই সঙ্গে সৌদি আরবের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য বেসামরিক পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে মার্কিন কংগ্রেসে বিরোধিতা জোরালো হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ওই চুক্তির আওতায় বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য সৌদি আরবকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণে সহায়তা করার পরিকল্পনা রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের। তবে এ ধরনের চুক্তি পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার ঠেকাতে যথেষ্ট সুরক্ষা নিশ্চিত করবে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।

স্যাটেলাইট চিত্রে কারখানা সম্প্রসারণের ইঙ্গিত

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক স্যাটেলাইট চিত্র সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান প্ল্যানেট ল্যাবস ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সৌদি আরবের আল-দাওয়াদিমি ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন কমপ্লেক্সের ছবি ধারণ করে। স্থাপনাটি রাজধানী রিয়াদ থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত।

ছবিগুলো বিশ্লেষণ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ফরেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এফপিআরআই) দুই গবেষক স্যাম লেয়ার ও মাইকেল ডুইটসম্যান। তাদের মূল্যায়ন অনুযায়ী, কমপ্লেক্সে একটি নতুন ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। ভবনটিতে ক্ষেপণাস্ত্রের মোটরের খোলের মধ্যে জ্বালানির মিশ্রণ ঢেলে জমাট বাঁধানোর জন্য ব্যবহৃত বিশেষ গর্ত বা কাস্টিং পিট থাকতে পারে।

গবেষকদের মতে, নতুন ভবনটির দুই পাশে এমন দেয়াল রয়েছে, যা দুর্ঘটনাজনিত বিস্ফোরণের প্রভাব কমিয়ে আশপাশের স্থাপনাকে সুরক্ষা দিতে পারে। ভবনটি কারখানার বিদ্যমান কাস্টিং পিট থাকা ভবনের তুলনায় অন্তত দ্বিগুণ বড়। এ ছাড়া সেখানে আরেকটি নতুন ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। এটি জ্বালানির উপাদান অথবা ক্ষেপণাস্ত্রের তৈরি যন্ত্রাংশ সংরক্ষণের কাজে ব্যবহৃত হতে পারে বলে ধারণা গবেষকদের।

লেয়ার ও ডুইটসম্যানের মতে, স্যাটেলাইট চিত্রে ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনকেন্দ্রের অবকাঠামো সম্প্রসারণের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তাদের ধারণা, এর উদ্দেশ্য আরো বড় ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করা, যেগুলো বেশি ওজনের বিস্ফোরক বহন করতে পারবে অথবা আরো দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম হবে।

সামরিক বাহিনীগুলোর কাছে কঠিন জ্বালানিচালিত ক্ষেপণাস্ত্রের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। কারণ, এগুলো দীর্ঘ সময় সংরক্ষণ করা যায় এবং তরল জ্বালানিচালিত ক্ষেপণাস্ত্রের তুলনায় দ্রুত উৎক্ষেপণ করা সম্ভব।

চীনা প্রযুক্তি ব্যবহারের ধারণা

এফপিআরআইয়ের গবেষকদের পাশাপাশি লন্ডনভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (আইআইএসএস) এবং গবেষণা ও বিশ্লেষণ সংস্থা সিএনএর বিশেষজ্ঞরাও মনে করেন, আল-দাওয়াদিমি কমপ্লেক্সে চীনা প্রযুক্তি ব্যবহারের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। কারখানাটির বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে চীনের ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনকেন্দ্রেরও মিল রয়েছে বলে জানিয়েছেন এফপিআরআইয়ের গবেষকেরা।

১৯৮৭ সালে চীনের কাছ থেকে গোপনে প্রায় ৪০টি তরল জ্বালানিচালিত ডিএফ-৩ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সংগ্রহ করেছিল সৌদি আরব। ১৯৯১ সালে প্রকাশিত যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর একটি অবমুক্ত মূল্যায়নে এ তথ্য উঠে আসে। ২০১৪ সালের এপ্রিলে একটি সামরিক কুচকাওয়াজে প্রথমবারের মতো এসব ক্ষেপণাস্ত্রের দুটি প্রদর্শন করে দেশটি।

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিও ও ছবি বিশ্লেষণ করে ইয়েমেনে সৌদি আরবের ছোড়া চীনা নকশার ডিএফ-১৫ ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ শনাক্ত করার দাবি করেছেন এফপিআরআইয়ের গবেষকেরা।

গবেষক লেয়ারের ধারণা, সৌদি আরব এখন নিজেরাই কঠিন জ্বালানিচালিত ডিএফ-১৫ ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করতে পারে। আল-দাওয়াদিমি কমপ্লেক্স সম্প্রসারণের উদ্দেশ্য আরো দূরপাল্লার ডিএফ-২১ অথবা একই ধরনের অন্য ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনও হতে পারে।

দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থা রফতানিতে বিধিনিষেধ আরোপ করে আসছে। এ কারণে সৌদি আরব চীনের দিকে ঝুঁকেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বদলে যেতে পারে শক্তির ভারসাম্য

আইআইএসএসের গবেষক সাশা ব্রুখমানের মতে, আরো দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র সৌদি আরবকে ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার মুখোমুখি না হয়েও দেশটিতে আঘাত হানার সুযোগ দিতে পারে। এতে ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষার ঝুঁকি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহ করা এফ-১৫ যুদ্ধবিমান ব্যবহার করার প্রয়োজন কমে আসতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি স্যাটেলাইট-গাইডেড বোমার প্রসঙ্গ টেনে ব্রুখমান বলেন, রাজনৈতিক কারণে তেহরানের ওপর এফ-১৫ যুদ্ধবিমান পাঠাতে অনিচ্ছা থাকলে এমন একটি ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থা প্রয়োজন হতে পারে, যা ইরানের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার হুমকি দিতে সক্ষম।

তিনি আরো বলেন, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের সাহায্যে সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থানে আঘাত হানার সক্ষমতায় ইরান এগিয়ে রয়েছে। সৌদি আরবের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা বাড়লে দুই দেশের মধ্যে এই ব্যবধান কিছুটা কমতে পারে।

এফপিআরআইয়ের বিশ্লেষণ পর্যালোচনা করে ব্রুখমান জানান, আল-দাওয়াদিমি কমপ্লেক্স সম্প্রসারণের উদ্দেশ্য আরো শক্তিশালী কঠিন জ্বালানিচালিত ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করা হতে পারে। প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠান জেনসও বিশ্লেষণটি পর্যালোচনা করেছে। প্রতিষ্ঠানটির মতে, নতুন ভবনগুলো উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো অথবা দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির প্রচেষ্টার ইঙ্গিত দিতে পারে।

সিএনএর বিশ্লেষক ডেকার ইভলেথও বাণিজ্যিক স্যাটেলাইট চিত্রের মাধ্যমে আল-দাওয়াদিমির নির্মাণকাজ পর্যবেক্ষণ করছেন। তিনি এফপিআরআইয়ের মূল্যায়নের সঙ্গে একমত। তার মতে, উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্যান্য দেশও তাদের আক্রমণাত্মক ও প্রতিরক্ষামূলক অস্ত্রভান্ডার সম্প্রসারণ করছে।

ইভলেথ বলেন, মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত ও তুরস্কেও একই ধরনের উদ্যোগ চলছে। এখন সবাই এ কাজ করছে।

গত বছর শুরু হয় নির্মাণকাজ

এফপিআরআইয়ের মূল্যায়ন অনুযায়ী, প্ল্যানেট ল্যাবসের স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা যায়, আল-দাওয়াদিমি কমপ্লেক্সের সম্প্রসারণকাজ শুরু হয় ২০২৫ সালের এপ্রিলে। ওই সময় সম্ভাব্য সংরক্ষণাগার নির্মাণের জন্য জমি পরিষ্কার ও খননকাজ শুরু হয়। একই মাসের শেষ দিকে অথবা মে মাসের শুরুতে ক্ষেপণাস্ত্রের জ্বালানি প্রস্তুতের সম্ভাব্য ভবনটির নির্মাণকাজ শুরু হয়।

২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বরের একটি ছবিতে ভবনটির ভেতরে দুটি গভীর গর্ত দেখা যায়। গবেষকদের মূল্যায়ন অনুযায়ী, তখনো ভবনটির ছাদ নির্মাণ করা হয়নি।

২০২৬ সালের ১৮ সেপ্টেম্বরের ছবিতে দেখা যায়, ভবনটির ছাদের কিছু অংশ তখনো অসম্পূর্ণ। দুই পাশে রয়েছে বিস্ফোরণের চাপ মোকাবেলার জন্য তৈরি ভারী দেয়াল। দুর্ঘটনাজনিত বিস্ফোরণে আশপাশের স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া ঠেকাতেই এগুলো নির্মাণ করা হয়েছে বলে ধারণা গবেষকদের।

তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনকেন্দ্রের ছবিতেও এ ধরনের দেয়াল দেখা যায়। এটি ভবনটিতে কঠিন জ্বালানিচালিত ক্ষেপণাস্ত্রের মোটর তৈরির সম্ভাবনাকে আরো জোরালো করে।

এফপিআরআইয়ের মূল্যায়ন অনুযায়ী, ছাদের কাজ শেষ করতে বেশি সময় লাগার কথা নয়। তবে জ্বালানি ঢালাইয়ের সরঞ্জাম স্থাপন করতে কয়েক মাস লাগতে পারে। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ স্থাপনাটিতে ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন শুরু হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে উদ্বেগ

এদিকে সৌদি আরবের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে সৌদি আরবকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণে সহায়তা দেয়ার পরিকল্পনা নিয়ে দুই দেশের সম্ভাব্য চুক্তির বিরোধিতা বাড়তে পারে মার্কিন কংগ্রেসে।

চুক্তিটির বিরোধীদের আশঙ্কা, এতে সৌদি আরবের গোপনে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির প্রচেষ্টা ঠেকানোর জন্য পর্যাপ্ত সুরক্ষাব্যবস্থা নেই। তবে সৌদি আরব এমন কোনো পরিকল্পনার কথা অস্বীকার করেছে।