যুদ্ধ খরচ কমাতে ইরানি সস্তা ড্রোনের ক্লোন করেছে যুক্তরাষ্ট্র
একুশ শতকের যুদ্ধে প্রযুক্তির ব্যবহার কতটা বদলে গেছে তার সর্বশেষ উদাহরণ ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধ। অস্ত্র হিসেবে এ যুদ্ধে আধিপত্য করছে ড্রোন, বিশেষ করে সস্তা ড্রোন।
যুক্তরাষ্ট্রের ৯০ হাজার কোটি ডলারের সামরিক বাজেটের তুলনায় এ খাতে ইরানের বরাদ্দ অতিক্ষুদ্র। গত বছর দেশটির প্রতিরক্ষা বাজেট ছিল প্রায় ২ হাজার ৩০০ কোটি ডলার। তবে এ অসাম্য যুদ্ধে তেহরানকে বিশেষ সুবিধা দিয়েছে কম খরচের এইচইএসএ শাহেদ ১৩৬ ড্রোন। স্বয়ংক্রিয় এ মানববিহীন আকাশযান (ইউএভি) অতি অল্প জায়গায় রাখা যায় এবং একবার হামলার জন্য তৈরি।
২০১৬ সালে ইরানের আইআরজিসির সঙ্গে যুক্ত শাহেদ অ্যাভিয়েশন ইন্ড্রাস্টিজ এ ড্রোন তৈরি শুরু করে। প্রতিটি ড্রোন তৈরিতে খরচ পড়ে ২০-৫০ হাজার ডলারের মধ্যে। বিপরীতে এসব উড়ন্ত বিভীষিকা ধ্বংস করতে ব্যবহৃত মার্কিন প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র নির্মাণে খরচ হয় ৪০ লাখ ডলার।
বলা যায়, খরচ বনাম যুদ্ধ ক্ষমতার অসাম্যই ইরানের প্রতিরক্ষা পরিকল্পনার মূল পরিকল্পনা। এতে যুদ্ধ শত্রুর জন্য দীর্ঘ সময় ধরে অযথাযথ ব্যয়সাপেক্ষ হয়ে ওঠে। এবং পর্যাপ্ত অর্থ থাকলেও ক্ষেপণাস্ত্র নির্মাণ বেশ সময়সাপেক্ষ। স্বভাবই শাহদ ড্রোনের কার্যকারিতা মার্কিন সেনাবাহিনীরও নজর এড়াতে পারেনি।
কয়েকটি মার্কিন কোম্পানি এখন শাহেদ ১৩৬-এর অনুপ্রেরণায় নিজস্ব সস্তা ড্রোন তৈরি করছে। এমনকি রিভার্স-ইঞ্জিনিয়ারিং করে একটি কোম্পানি এফএলএম ১৩৬ নামের ড্রোন তৈরি করেছে, যা প্রথমবার ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হচ্ছে।
গত বছর অ্যারিজোনাভিত্তিক স্পেক্টর ওয়ার্কসের মাধ্যমে প্রথমবার সস্তা মার্কিন ড্রোন উন্মোচিত হয়। এফএলএম ১৩৬-কে ‘লো-কস্ট আনক্রুড কমব্যাট অ্যাটাক সিস্টেম’ বা সংক্ষেপে লুকাস বলা হয়। ছোট একটি টিম এটি চালাতে পারে এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে উড্ডয়ন ও অবতরণে সক্ষম।
লুকাসের আকার শাহেদ ১৩৬-এর মতোই। দৈর্ঘ্য ৩ মিটার, প্রস্থ আড়াই মিটার। তবে শাহেদের ২০০ কেজি ওজনের তুলনায় এটি অনেক হালকা, সাড়ে ৮১ কেজি। আবার শাহেদ ৫০ কেজি ওজন বহন করলেও মার্কিন যুদ্ধযানটি ১৮ কেজি ওজন বহনে সক্ষম। এফএলএম-১৩৬ সর্বোচ্চ ৬ ঘণ্টা হামলা চালাতে পারে, পরিসীমা ৪৪৪ নটিক্যাল মাইল এবং সর্বোচ্চ উড্ডীয়নসীমা ১৫ হাজার ফুট বা ৪ হাজার ৫০০ মিটার।
কম্বাশ্চন ইঞ্জিনচালিত এ ড্রোনের গতি ঘণ্টায় ১৩৭ কিলোমিটার এবং সর্বোচ্চ ১৯৪ কিলোমিটার। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে হলো, প্রতিটি ড্রোন নির্মাণে খরচ প্রায় ৩৫ হাজার ডলার অর্থাৎ শাহেদ-১৩৬ এর সমান।
ক্লোনকৃত সস্তা মার্কিন ড্রোনগুলো এখন টাস্ক ফোর্স স্করপিয়ন স্ট্রাইক (টিএফএসএস) নামে মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড ইউনিট ইরানে হামলার জন্য ব্যবহার করছে। যদিও মার্কিন সেনাবাহিনী এখনো বৃহৎ অস্ত্রাগার ব্যবহার করতে পারে, তবে কম খরচে ড্রোন উৎপাদনের সক্ষমতা দীর্ঘমেয়াদে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ গতকাল বলেছিলেন, ইরান ড্রোন আধিপত্য হারাচ্ছে। সেই জায়গা দখল করছে যুক্তরাষ্ট্র।
২০২৫ সালের জুলাইয়ে পেন্টাগনে হেগসেথ আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ড্রোনটি প্রদর্শিত হয়। সেখানে ১২টি শীর্ষস্থানীয় মার্কিন ড্রোন নির্মাতা নতুন সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহের জন্য প্রতিযোগিতা করে। ওই অনুষ্ঠানের আগে ‘আনল্যাসিং আমেরিকান ড্রোন ডমিন্যান্স’ নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেন ট্রাম্প। ওই আদেশের লক্ষ্য ছিল মার্কিন বাণিজ্যিক ও বিশেষ করে সামরিক ড্রোন খাতকে উৎসাহদান। এরপর গত ডিসেম্বরে ড্রোন সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোকে দ্রুত ও সস্তায় ৩ লাখ ড্রোন সরবরাহের অনুরোধ জানায় মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দুই ছেলে এরিক ও ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়র সরাসরি মালিকানায় না থাকলেও বিনিয়োগের মাধ্যমে ড্রোন শিল্পে যুক্ত হচ্ছেন। ড্রোন নির্মাতা পাওয়ারুসের একটি ব্যবসায়িক সংযুক্তির সঙ্গে রয়েছেন তারা।
ইউরো নিউজ অবলম্বনে
