ইরানের দুর্গম পাহাড়ে যেভাবে দুদিন টিকে ছিলেন সেই মার্কিন কর্নেল

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ১০:০৫ পিএম, রোববার, ৫ এপ্রিল ২০২৬ | ৬১

শুক্রবারের সে মুহূর্তটা ছিল ভয়াবহ। ইরানের আকাশে উড়তে থাকা একটি এফ-১৫ ই স্ট্রাইক ঈগল ফাইটার জেট হঠাৎ ভূমি থেকে ছোড়া একটি ইরানি প্রজেক্টাইলের আঘাতে বিধ্বস্ত হয়। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে দুই বৈমানিককে ইজেকশন সিটের হলুদ লিভার টানতে হয়। আর সেই মুহূর্ত থেকেই শুরু হয় বেঁচে থাকার লড়াই। একজন বৈমানিককে শুরুতেই উদ্ধার করা হলেও কর্নেল পদমর্যাদার আরেকজন নিখোঁজ ছিলেন দুদিন ধরে।

জেট থেকে বের হওয়াটাই ছিল প্রথম পরীক্ষা। বিমানটির রকেট প্রপেলান্ট চালিত ইজেকশন সিস্টেম পাইলটকে প্রতি সেকেন্ড স্কয়ারে ২০০ মিটার বেগে ক্যানোপি ভেদ করে বাইরে ছুঁড়ে দেয়। এটি বিশ্বের অন্যতম আধুনিক ইজেকশন ব্যবস্থা, কিন্তু এ প্রক্রিয়ায় মেরুদণ্ডে ফ্র্যাকচারসহ গুরুতর আঘাত পাওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত বেশি। এ কর্নেলের ক্ষেত্রেও ঠিক তাই হয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ইরানের দক্ষিণাঞ্চলের রুক্ষ, শুষ্ক ও দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় অবতরণ করেন তিনি। মার্কিন সামরিক প্রশিক্ষণ অনুযায়ী, শত্রু অঞ্চলে বিমান থেকে ইজেক্ট করা এয়ারম্যানদের নির্দেশ থাকে—যতটা সম্ভব লুকিয়ে থাকো এবং রেসকিউ টিমের জন্য অপেক্ষা করো। এই এয়ারম্যান ঠিক সেটিই করেন। পাহাড়ি অঞ্চলের প্রাকৃতিক গঠন পাথুরে ঢাল, শুকনো খাদ, ঝোপঝাড়—এসবকে কাজে লাগিয়ে তিনি নিজেকে লুকিয়ে রাখেন। দিনের বেলা যতটা সম্ভব স্থির থাকেন, যাতে তাপচিত্র বা নজরদারি ড্রোনের চোখ এড়িয়ে যাওয়া যায়। তার কাছে ছিল শুধু একটি পিস্তল ও ফ্লেয়ার। সরাসরি সংঘর্ষ এড়িয়ে যাওয়াই ছিল তার প্রধান কৌশল। অনুমান করা হচ্ছে, তিনি অবস্থান বদল করতেন খুব সীমিতভাবে, যাতে কোনো চিহ্ন না রেখে শত্রুপক্ষকে বিভ্রান্ত করা যায়। একই সঙ্গে তিনি এমন জায়গা বেছে নিয়েছিলেন, যেখান থেকে চারপাশ নজর রাখা যায় কিন্তু নিজেকে দৃশ্যমান না করা যায়।

ইরান সরকার খবর ছড়িয়ে দেয়, স্থানীয়দের পুরস্কারের লোভ দেখায়। সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, কয়েক ডজন স্থানীয় মানুষ পাহাড়ি এলাকায় তল্লাশি চালাচ্ছে। ইরানি সামরিক বাহিনীর কনভয় ক্রমশ এগিয়ে আসছিল। ট্রাম্প নিজেই পরে বলেন, ‘এ সাহসী যোদ্ধা শত্রু দেশের দুর্গম পাহাড়ে লুকিয়ে ছিলেন, আর শত্রুরা ঘণ্টায় ঘণ্টায় আরও কাছে আসছিল।’

রেসকিউ অপারেশনের চূড়ান্ত মুহূর্তে নাটকীয়তা আরো বাড়ে। সিআইএ তার সঠিক অবস্থান চিহ্নিত করে এবং ইরানকে বিভ্রান্ত করতে একটি ডিসেপশন অপারেশন চালায়। মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে দেয়া হয় যে ওই পাইলটেকে অন্যত্র পাওয়া গেছে। ইরান সেদিকে মনযোগ দেয়। এ সুযোগে নেভি সিল টিম-৬ এর কমান্ডোরা এগিয়ে আসেন। প্রায় ৭ হাজার ফুট উচ্চতার একটি রিজলাইনে উঠে তিনি উদ্ধারকারী বাহিনীর সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করেন। পেছনে তখন বোমা পড়ছে, মার্কিন বাহিনী ইরানি কনভয়ের ওপর গুলি চালাচ্ছে।

উদ্ধার অভিযানে যুক্ত ছিল মার্কিন বিশেষ বাহিনীর শতাধিক সদস্য। বিশেষভাবে প্রস্তুত এমসি-১৩০জে কমান্ডো-২ পরিবহন বিমানে করে তারা অস্থায়ী রানওয়েতে অবতরণ করে। আকাশ থেকে সহায়তা দেয় এমকিউ-৯ র‌্যাপার ড্রোন ও যুদ্ধবিমান, যারা আশপাশের হুমকি চিহ্নিত করে হামলা চালায়।

অপারেশন শেষে দুটি এমসি-১৩০জে বিমান মাটিতে আটকে যায়। সেগুলো যাতে ইরানের হাতে না পড়ে সেজন্য মার্কিন সেনারা নিজেরাই ধ্বংস করে দেয়। প্রতিটি বিমানের মূল্য ছিল ১০ কোটি ডলার। অবশেষে কুয়েতের একটি হাসপাতালে পৌঁছানো হয় সেই কর্নেলকে। রোববার ভোরে ট্রাম্প তার ট্রুথ সোশালে ঘোষণা দেয়, ‘উই গট হিম’।

দ্য টেলিগ্রাফ অবলম্বনে