দালালদের বিচারের দাবি পরিবারের

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে নিখোঁজ গোপালপুরের তিন যুবক

গোপালপুর (টাঙ্গাইল) প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ০১:০৫ পিএম, বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬ | ৮৫

নির্মাণপ্রতিষ্ঠানে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে জনপ্রতি প্রায় ১০ লাখ টাকা নিয়ে টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার তিন যুবকসহ ৩০ বাংলাদেশিকে রাশিয়ায় পাঠানোর অভিযোগ উঠেছে।

সেখানে পৌঁছানোর পর তাঁদের পাসপোর্ট ও মুঠোফোন কেড়ে নিয়ে রাশিয়ার সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হয়। মাত্র ২১ দিনের সামরিক প্রশিক্ষণ শেষে তাঁদের রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয় বলে জানা গেছে।

তাঁদের মধ্যে ২০ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)। এ ঘটনায় নিখোঁজ স্বজনদের সন্ধান এবং কেউ মারা গেলে তাঁর মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন পরিবারের সদস্যরা।

গত ১৪ অক্টোবর এক সংবাদ সম্মেলনে এসআরবি জানায়, গত ৭ মে জাবালে নূর, আরএস ইন্টারন্যাশনাল ও টিএস গ্রুপ নামের তিন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ৩০ বাংলাদেশি রাশিয়ায় যান। সংস্থাটির প্রাথমিক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, যুদ্ধক্ষেত্রে প্রতিপক্ষের অবস্থান শনাক্ত করতে বাংলাদেশিদের একধরনের টোপ হিসেবে ব্যবহার করা হতো। তাঁদের ওপর ড্রোন হামলা হলে হামলাকারীদের অবস্থান ও দূরত্ব নির্ণয় করা সম্ভব হতো বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এসআরবির তথ্য অনুযায়ী, ৩০ জনের মধ্যে ২০ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। দুজন গুরুতর আহত অবস্থায় দেশে ফিরেছেন, দুজন মস্কোতে চিকিৎসাধীন এবং বাকি ছয়জন এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।

এই ৩০ জনের মধ্যে রয়েছেন টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার দক্ষিণ পাথালিয়া গ্রামের মৃত কছর উদ্দিনের ছেলে আমিনুল ইসলাম, মজিদপুর গ্রামের পরেশ চন্দ্র সূত্রধরের একমাত্র ছেলে পবিত্র চন্দ্র এবং বীর নলহরা গ্রামের মৃত ইসমাইলের ছেলে নজরুল ইসলাম। তাঁদের বর্তমান অবস্থান ও শারীরিক অবস্থা নিয়ে চরম উদ্বেগে রয়েছেন স্বজনেরা।

নজরুল ইসলামের স্ত্রী আছমা বলেন, ‘আমার ছোট ছোট অবুঝ শিশু বাচ্চাদের দায়িত্ব কে নেবে? বিভিন্ন এনজিও ও মানুষের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে টাকা জোগাড় করে আমার স্বামীকে রাশিয়ায় পাঠিয়েছি। চার মাস ধরে তাঁর কোনো খবর পাচ্ছি না। সরকারের কাছে আমার আবেদন, তিনি যদি মারা গিয়ে থাকেন, তাহলে তাঁর লাশ যেন দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। আর যারা প্রতারণা করে তাঁকে পাঠিয়েছে, তাদের বিচার চাই।’

স্বামীকে হারানোর আশঙ্কায় দিশেহারা আছমা এখন সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন। ঋণের বোঝা আর সংসারের ব্যয় মেটানোর দুশ্চিন্তা তাঁর উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

মজিদপুর গ্রামের পবিত্র চন্দ্রের বাবা পরেশ চন্দ্র বলেন, ‘বিভিন্ন মাধ্যমে আমার ছেলের মৃত্যুর খবর আসছে। কিন্তু আসলে কী ঘটেছে, তা সরকারের মাধ্যমে জানতে পারিনি। আমার ছেলে জীবিত আছে, নাকি মারা গেছে, সেই খবরও পাচ্ছি না। আমাদের সংসারে একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি আমার ছেলে। আমি আমার ছেলেকে চাকরি করতে পাঠিয়েছি, যুদ্ধ করতে পাঠাইনি। আমার ছোট ছোট নাতি-নাতনিকে কে দেখবে?’

ছেলের প্রকৃত অবস্থা জানতে সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তিনি। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তির অনুপস্থিতিতে তাঁদের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি কল রেকর্ডে গোপালপুরের তিন যুবকের মধ্যে দুজনের নাম উল্লেখ করে তাঁদের নিয়ে উদ্বেগজনক দাবি করা হয়। অডিওতে নিজেকে জামালপুরের আরমান পরিচয় দেওয়া এক ব্যক্তি দাবি করেন, রাশিয়ায় যাওয়া কয়েকজন বাংলাদেশি যুদ্ধক্ষেত্রে মারা গেছেন এবং কয়েকজনকে আটকে রেখে নির্যাতন করা হচ্ছে। তবে অডিওতে করা এসব দাবির সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

তিন পরিবারের সদস্যরা জানান, তাঁদের স্বজনদের বর্তমান অবস্থান কিংবা মৃত্যুর বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে পাননি। ফলে প্রতিদিনই তাঁরা অপেক্ষা করছেন প্রিয়জনের কোনো খবরের আশায়।

নিখোঁজ তিন যুবকের প্রত্যেকের পরিবারেই রয়েছে ছোট ছোট সন্তান। উপার্জনক্ষম ব্যক্তিদের অনুপস্থিতিতে সন্তানদের ভরণপোষণ, ঋণ পরিশোধ ও সংসারের খরচ চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন পরিবারের সদস্যরা। একদিকে স্বজনদের জীবিত ফিরে পাওয়ার আশা, অন্যদিকে মৃত্যুসংবাদের আশঙ্কা সব মিলিয়ে চরম মানসিক ও আর্থিক সংকটে দিন কাটছে তাঁদের।

পরিবারগুলোর দাবি, নিখোঁজ যুবকদের অবস্থান শনাক্ত করে দ্রুত তাঁদের বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য জানাতে হবে। কেউ মারা গিয়ে থাকলে মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে তাঁদের বিদেশে পাঠানোর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

গোপালপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রুহুল আমিন বলেন এ বিষয়ে আমি অবগত নই, তাদের  পরিবারের পক্ষ থেকে যদি কোন আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য থানায় আসে অবশ্যই তাদের সহায়তা ও আনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।